লাইফস্টাইল ডেস্ক: শীতের সকালে গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য হলো গাছিদের গাছ থেকে নামানো কাঁচা খেজুরের রস। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মাটির ভাঁড়ে ভরা এই মিষ্টি রস খাওয়ার আনন্দ অতুলনীয়। কিন্তু গত দুই দশকে এই আনন্দের সাথে যুক্ত হয়েছে এক মরণঘাতী আতঙ্ক- নিপাহ ভাইরাস। অসাবধানতাবশত কাঁচা রস পান করা এখন জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, নিপাহ একটি অত্যন্ত উচ্চ মৃত্যুহারসম্পন্ন রোগ। বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার গড়ে ৭০ শতাংশেরও বেশি, যা অনেক ক্ষেত্রে কোভিডের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক।


নিপাহ একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়। এর প্রধান প্রাকৃতিক বাহক হলো টেরোপাস প্রজাতির ফলখেকো বাদুড়। শীতকালে যখন গাছিরা খেজুর গাছে হাঁড়ি পাতেন, তখন বাদুড় সেই রস খেতে আসে। রস খাওয়ার সময় বাদুড়ের লালা, মল বা মূত্র রসের সাথে মিশে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিপাহ ভাইরাস শীতল পরিবেশে বা তরল রসে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। ফলে যখন কোনো ব্যক্তি সেই সংক্রামিত কাঁচা রস পান করেন, তখন ভাইরাসটি সরাসরি তার শরীরে প্রবেশ করে। এছাড়া নিপাহ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলেও সুস্থ মানুষ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারে।
নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গগুলো শুরুতে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা জ্বরের মতো মনে হতে পারে, যা অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে:
প্রাথমিক ধাপ: তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, গলা ব্যথা এবং মাংসপেশিতে ব্যথা।
শ্বাসকষ্ট: অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়।
স্নায়বিক জটিলতা: নিপাহ ভাইরাসের সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো এটি সরাসরি মস্তিষ্ককে আক্রমণ করে। এর ফলে রোগী প্রলাপ বকতে শুরু করে, খিঁচুনি হয় এবং খুব দ্রুত অচেতন বা কোমায় চলে যায়।
নিপাহ ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ বা প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। হাসপাতালে যে চিকিৎসা দেওয়া হয় তা মূলত সাপোর্টিভ কেয়ার। অর্থাৎ রোগীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সচল রাখা এবং উপসর্গ কমানোর চেষ্টা করা হয়। এর উচ্চ মৃত্যুহার এবং দ্রুত মস্তিষ্ক বিকল করে দেওয়ার ক্ষমতার কারণেই একে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক প্যাথোজেন হিসেবে গণ্য করা হয়।
নিপাহ থেকে বাঁচতে চিকিৎসকরা কিছু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেন:
* খেজুরের রস খাওয়ার একমাত্র নিরাপদ উপায় হলো এটি উচ্চ তাপে ফুটিয়ে পান করা। রস জ্বাল দিয়ে গুড় বা পাটালি তৈরি করলে তাতে ভাইরাসের ঝুঁকি থাকে না।
* গাছে থাকা অবস্থায় পাখি বা বাদুড় যে ফলে মুখ দিয়েছে বা খুবলে খেয়েছে, তা কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না।
* রস সংগ্রহের হাড়িগুলো যদি 'বন নেট' বা জাল দিয়ে ঢেকে রাখা যায়, তবে বাদুড়ের সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। তবে এটি শতভাগ নিরাপদ নয়।
* নিপাহ আক্রান্ত রোগীর সেবা করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে এবং সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available