মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি: কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উৎপাদনের মূলভিত্তি সুস্থ ও উর্বর মাটি। কিন্তু মোল্লাহাট উপজেলাজুড়ে সরকারের অনুমোদনবিহীন, ভেজাল ও নিষিদ্ধ কোম্পানির সার–কীটনাশক অবাধে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বৈধ–অবৈধ বিভিন্ন দোকানে এসব পণ্য প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়ায় একদিকে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা ও খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
উপজেলার চুনখোলা ইউনিয়নের আঙরা গ্রামে সুকলা বিশ্বাসের বাড়ির সামনে একটি মুদি দোকানের পেছনের কক্ষে সার ও কীটনাশক বিক্রি হতে দেখা যায়। সাংবাদিক পরিচয় জানানো হলে তিনি ফোনে শিহাব মুন্সী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন।


একপর্যায়ে উপস্থিত হয়ে শিহাব মুন্সী বলেন, ‘কীটনাশকের লাইসেন্স থাকলে সার বিক্রি করা যায়।’ তিনি দাবি করেন, ম্যানেজারের অনুপস্থিতিতে সুকলাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সুকলার বক্তব্য ও তার দাবির মধ্যে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়।

চুনখোলা বাজারের খুচরা ডিলার শরীফ এবাদুল হকের দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক পাওয়া গেলে তিনি জানান, সেগুলো কোম্পানিতে ফেরত পাঠানো হবে। একই বাজারের আরেক খুচরা ডিলারের দোকানে বিপুল পরিমাণ ভুয়া কোম্পানির সার মজুত থাকতে দেখা গেছে।
পাশের মেসার্স জাফর বীজ ভান্ডারে ম্যানেজার পরিচয়ে মোস্তাফিজুরকে লাইসেন্স ছাড়াই বীজের সঙ্গে সার বিক্রি করতে দেখা যায়। কোদালিয়া ইউনিয়নের চাউলটুরী বাজারে সুবাস মৃধা নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স ছাড়াই সার ও কীটনাশক বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি লাইসেন্স থাকার দাবি করলেও প্রদর্শিত লাইসেন্সটি ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ এবং অন্য নামের। এ সময় তার পক্ষে দোকানঘরের মালিক সাংবাদিকদের অনৈতিক সমঝোতার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
খুলনার মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম আসাদ বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের সার ব্যবহারে মাটির ওপর বহুমাত্রিক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
তিনি বলেন, ‘ভেজাল সারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। এতে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পাশাপাশি এসব সারে লেড ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকলে তা মাটির ভৌত গঠন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও উপকারী অনুজীবের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে।’
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, মাটিতে জমা হওয়া ভারী ধাতু খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তার মতে, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম ও নির্ভেজাল সার প্রয়োগই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের একমাত্র উপায়।
চুনখোলা ইউনিয়নের প্রধান সার ডিলার আরিফুল মুন্সী সাংবাদিকদের বলেন, ‘চুরি বন্ধ হলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তার দাবি, লাইসেন্স ছাড়া বিক্রেতারা কৃষকের দোরগোড়ায় সার–কীটনাশক পৌঁছে দেন বলেই কৃষক সুবিধা পান। তিনি অনুরোধ করে বলেন, ‘এসব নিউজ না করে ভাই-ব্রাদার হিসেবে সুযোগ দেন।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু জানান, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available