ডেস্ক রিপোর্ট: সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীরা গত প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।
এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সে বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত বৈষম্য কমিয়ে সমতাভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে স্কেল আগামী মাস থেকেই কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
বর্তমানে কার্যকর অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের মধ্যে পার্থক্য রাখা হয়েছে প্রায় ১:৮ অনুপাতে। বর্তমানে এই অনুপাত ১:৯.০৭৬। এর আগের বেতনকাঠামোগুলোতেও প্রায় একই ধরনের অনুপাত বজায় রাখা হয়েছিল।
কমিশনের সুপারিশে সব গ্রেডেই মূল বেতন দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারীর বাড়ি ভাড়াসহ মূল বেতনের সঙ্গে অন্যান্য ভাতা যোগ করে মোট প্রাপ্য দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা।
নতুন বেতনকাঠামোর প্রস্তাব অনুযায়ী গ্রেড-১-এর মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, গ্রেড-২-এর বেতন ৬৬ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা, গ্রেড-৩-এর বেতন ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা এবং গ্রেড-৪-এর বেতন ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্রেড-৫-এর বেতন ৪৩ হাজার টাকা থেকে ৮৬ হাজার টাকা, গ্রেড-৬-এর বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭১ হাজার টাকা, গ্রেড-৭-এর বেতন ২৯ হাজার টাকা থেকে ৫৮ হাজার টাকা, গ্রেড-৮-এর বেতন ২৩ হাজার টাকা থেকে ৪৭ হাজার ২০০ টাকা এবং গ্রেড-৯-এর বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
গ্রেড-১০-এর বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা, গ্রেড-১১-এর বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা, গ্রেড-১২-এর বেতন ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৩-এর বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১৪-এর বেতন ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে গ্রেড-১৫-এর বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা, গ্রেড-১৬-এর বেতন ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, গ্রেড-১৭-এর বেতন ৯ হাজার টাকা থেকে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, গ্রেড-১৮-এর বেতন ৮ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২১ হাজার টাকা, গ্রেড-১৯-এর বেতন ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-২০-এর বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তিন ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য পৃথক একটি ধাপ (স্টেপ) তৈরি করবে অর্থ বিভাগ, যা পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।
প্রতি বছরের মতো এবারের বাজেট সংক্ষিপ্তসারের ‘বিবরণী-২ খ’-এ পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে কর্মকর্তাদের বেতন, কর্মচারীদের বেতন এবং ভাতাদি—এই তিন খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দের হিসাব দেখানো হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বাজেট সংক্ষিপ্তসারের ‘বিবরণী-৪’-এ পরিচালন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বেতন-ভাতা বাবদ আগামী অর্থবছরের জন্য ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
বাজেটের সম্পদের ব্যবহার অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ ছিল ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। সে হিসাবে এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত এই ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকার মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার জনসেবা খাতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের ৭২ হাজার ২৪ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ বেশি। পরে এ বরাদ্দ সংশোধন করে ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা করা হয়েছিল। সে হিসাবে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন বরাদ্দ প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।
তবে এ বরাদ্দের পুরো অর্থ শুধু সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতার জন্য ব্যয় হবে না। এর মধ্যে নতুন নিয়োগ, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং পেনশনভোগীদের অতিরিক্ত সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
(এই ওয়েবসাইটের যেকোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি)
© 2026, এশিয়ান অনলাইন টিভি  |  সর্বস্বত্ব সংরক্ষিতDeveloped by Future IT
Recent comments
Latest Comments section by users
No comment available