• ঢাকা
  • |
  • শুক্রবার ১৮ই বৈশাখ ১৪৩৩ রাত ১১:২৪:০০ (01-May-2026)
  • - ৩৩° সে:
রোজিনার জীবন সংগ্রাম যেন জীবন যুদ্ধের এক দৃষ্টান্ত

রোজিনার জীবন সংগ্রাম যেন জীবন যুদ্ধের এক দৃষ্টান্ত

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: সূর্যের প্রথম আলো ওঠার আগেই শুরু হয় যার জীবন সংগ্রাম, নাম তার রোজিনা বেগম। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আঁকাবাঁকা এক সরু গলিতে তার বসবাস, রোজিনা স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর তার জীবনে নেমে আসে দুঃসহ অনিশ্চয়তা, কিন্তু ভেঙে পড়ার অবকাশ পাননি তিনি। দুই সন্তানের মুখের হাসি আর তাদের ভবিষ্যতের আশাই তাকে প্রতিদিন নতুন করে লড়াইয়ের শক্তি জোগায়।হৃদয়ের গোপন ব্যথা আর অশ্রু চাপা রেখে তিনি বেছে নিয়েছেন শহরের বর্জ্য সংগ্রহের কঠিন পেশা। এই কষ্টসাধ্য পথই এখন তার বেঁচে থাকার অবলম্বন-যেখানে প্রতিটি সকাল মানে নতুন সংগ্রাম, আর প্রতিটি দিন মানে সন্তানদের জন্য একটু ভালো আগামী গড়ার নিরন্তর চেষ্টা।ফতুল্লা বাজার এলাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন রোজিনা। সমাজের চোখে এই কাজ হয়তো অবহেলিত, কিন্তু রোজিনার কাছে এটিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। প্রতিদিন সকালে একটি পুরোনো ভ্যান, হাতে বালতি আর কাঁটা নিয়েই শুরু হয় তার দীর্ঘ যাত্রা। প্রায় ৩০০টি বাসার দরজায় কড়া নাড়া, প্রতিটি বাড়ির আবর্জনা সংগ্রহ করা- এ যেন এক অন্তহীন যাত্রা।সংগ্রহের পর শুরু হয় আরও কঠিন পর্যায়। ভ্যান চালিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে যেতে হয় ডাম্পিং পয়েন্টে। ভ্যান নিয়ে যেখানে বর্জ্য নামাতে হয় সে পথে ছড়িয়ে থাকে ভাঙা কাচ, ধারালো লোহা এবং বিষাক্ত মেডিকেল বর্জ্য। প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, প্রতিটি নিঃশ্বাসে অসুস্থতার ভয়। কিন্তু শরীরের এই ক্ষত আর ঝুঁকির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় সন্তানদের মুখে একমুঠো খাবারের চিন্তা। তাই ভয়কে জয় করেই এগিয়ে যান তিনি।দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন রোজিনা ঘরে ফেরেন, সন্তানদের হাসিমুখ দেখলে তার সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। জীবনের এই কঠিন বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রোজিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার দুটি সন্তান। আমার মেয়েটি মাদ্রাসায় পড়ে, ওর পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। আমার অন্য সন্তানটি ২৮ পারা কোরআনের হাফেজ হয়েছে, যে অর্জন যেকোনো মায়ের জন্য গর্বের। কিন্তু অভাবের তাড়নায়, পড়াশোনার খরচ আর জোগাড় করতে না পেরে সে এখন আমার সাথে কাজে করে। একজন হাফেজের হাতে এখন ময়লার বালতি দিচ্ছি আমি এতে আমার বুকটা ফেটে যায়, কিন্তু পেটের ক্ষুধা আর সংসারের দায় আমাকে আর আমার সন্তানকে এই পথে হাঁটতে বাধ্য করছে।’প্রান্তিক পর্যায়ের এই সাহসী নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের কথা জানান নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক ভিকারুন নেছা। তিনি বলেন, “সরকার শ্রমিকদের উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে রোজিনাদের মতো প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”নারায়ণগঞ্জ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, ‘রোজিনা আমাদের সমাজের হাজারো অদেখা শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি। যাদের ঘামে গড়ে ওঠে শহরের পরিচ্ছন্নতা, যাদের ত্যাগে সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে চলে, অথচ দিনশেষে তারা রয়ে যান অগোচরে।’তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিকের মর্যাদা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শ্রমিক দিবসে রোজিনাদের মতো সংগ্রামী মানুষদের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই অঙ্গীকার। কারণ, বর্জ্যের স্তূপের মাঝেও তারা স্বপ্নের বীজ বোনেন।’